মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)
উনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহাকাব্য রচয়িতা। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী লেখক, প্রথম আধুনিক কবি, প্রথম আধুনিক নাট্যকার, প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক, বাংলা সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতার প্রথম রচয়িতা, সার্থক ট্রাজেডির প্রথম রচয়িতা, প্রথম প্রহসন রচয়িতা, পুরাণকাহিনির ব্যত্যয় ঘটিয়ে আধুনিক সাহিত্যরস সৃষ্টির প্রথম শিল্পী এবং পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যধারার সংমিশ্রণে নতুন ধরনের মহাকাব্য রচয়িতা।
- মাইকেল মধুসূদন দত্ত ২৫ জানুয়ারি, ১৮২৪ সালে যশোর জেলার কেশবপুরের কপোতাক্ষ নদীর তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তার পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ও মাতা জাহ্নবী দেবী।
- তিনি ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৮৪৩ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ওল্ড মিশন চার্চে পাদ্রী ডিলট্রির কাছে খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। এদিন থেকে তার নামের আগে 'মাইকেল' শব্দটি যোগ হয়। তাঁর ধর্মান্তরণ সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ফলে তাঁর পিতা রাজনারায়ণ দত্ত তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। হিন্দু কলেজে খ্রিষ্টানদের অধ্যয়ন নিষিদ্ধ বলে তিনি এ কলেজ থেকে (১৮৪৩) বিতাড়িত হন।
- ছাত্রজীবনে তিনি নারী শিক্ষার উপর ইংরেজি কবিতা রচনা করে 'বেঙ্গল স্পেকটেটর', 'লিটার্যারি গেজেট', 'লিটার্যারি ব্লসম কমেট' পত্রিকায় প্রকাশ করেন।
- মাদ্রাজে অবস্থানকালে তিনি কিছুদিন 'হিন্দু ক্রোনিকল' পত্রিকায় সম্পাদকের কাজ করেন।
- তিনি কলকাতার আলিপুর হাসপাতালে ২৯ জুন, ১৮৭৩ সালে মারা যান।
মধুসূদন দত্তকে 'দত্ত কুলোদ্ভব' কবি বলা হয় তার কারণঃ
কুল অর্থ বংশ এবং উদ্ভব অর্থ উৎপত্তি বা জন্ম। 'দত্ত কুলোদ্ভব' মানে দত্ত বংশে উৎপত্তি বা জন্ম। খ্রিস্টীয় আঠার শতকে যশোরের সাগরদাঁড়ী গ্রামের প্রতাপশালী ব্যক্তি ছিলেন রামনিধি দত্ত। তাঁর চার পুত্রের মধ্যে কনিষ্ঠ ছিলেন রাজনারায়ণ দত্ত। তিনি পেশায় ছিলেন উকিল এবং জমিদারীতেও ছিল ব্যাপক সুনাম। এ দত্ত বংশে জন্মের কারণে মাইকেল মধুসূদনকে 'দত্ত কুলোদ্ভব' কবি বলা হয়।
মধুসূদনের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থের নাম The Captive Lady (১৮৪৯): ইংরেজিতে লিখিত। তিনি Timothy Penpoem ছদ্মনামে মাদ্রাজের 'হিন্দু ক্রোনিকল', 'মাদ্রাজ সার্কুলার', ও 'স্পেকটেটর' পত্রিকায় কবিতা লিখতেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সনেট কবিতার নাম 'বঙ্গভাষা': এটি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে অষ্টক ও ষটকে বিভক্ত। কবিতাটিতে কবির বক্তব্য হলো- মাতৃভাষার প্রতি উপেক্ষার অনুতাপ। এটির প্রথমে নাম ছিল 'কবি মাতৃভাষা'।
মধুসূদনের প্রথম প্রকাশিত বাংলা গ্রন্থের নামঃ
'শর্মিষ্ঠা' (১৮৫৯): বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নাটক তিনি ১৮৫৮ সালে কলকাতার পাইকপাড়ার রাজানে অনুপ্রেরণায় বেলগাছিয়া থিয়েটারের জন্য নাটকটি রচন করেন এবং তাদের অনুপ্রেরণা ও অর্থায়নে জানুয়ারি, ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হয়। মহাভারতের দেবযানী-যযাতি উপাধার অবলম্বনে পাশ্চাত্য রীতিতে এটি রচিত। চরিত্র: যযাতি দেবযানী, শর্মিষ্ঠা, মাধব্য, পূর্ণিমা, রাজমন্ত্রী। এটি মহাক কালিদাসকে উৎসর্গ করেন।
| কৃষ্ণচরিত (প্রবন্ধ) | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
| কৃষ্ণপক্ষ (গল্পগ্রন্থ) | আবদুল গাফফার চৌধুরী |
| কৃষ্ণপক্ষ (উপন্যাস) | হুমায়ূন আহমেদ |
| কৃষ্ণকুমারী (নাটক) | মাইকেল মধুসূদন দত্ত |
| কন্যাকুমারী (উপন্যাস) | আবদুর রাজ্জাক |
মধুসূদনের অন্যান্য নাটকগুলোর নাম
'পদ্মাবতী' (১৮৬০): বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক কমেডি এ নাটকের ২য় অঙ্কের ২য় গর্ভাঙ্কে প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্ প্রয়োগ করেন। এটি গ্রিক পুরাণের Apple of Discord অবলম্বনে রচিত। গ্রিক পুরাণের দেবী জুনো, প্যালেস ও ভেনাস এ নাটকে রূপায়িত হয়েছেন শচী, মুরজা ও রতি নামে। হেলেন ও প্যারিস হয়েছেন পদ্মাবতী ও ইন্দ্রনীল নামে। তিন দেবীর মধ্যে রতিকে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নির্বাচন করায় অন্য দুই দেবী ইন্দ্রনীলের উপর রুষ্ট হন। ফলে ইন্দ্রনীলের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। পরে দেবী রতির প্রচেষ্টায় ইন্দ্রনীল উদ্ধার হন এবং বিচ্ছিন্ন স্ত্রী পদ্মাবতীর সাথে মিলন ঘটে।
'কৃষ্ণকুমারী' (১৮৬১): বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্রাজেডি।
'মায়াকানন' (১৮৭৪): এটি তাঁর রচিত সর্বশেষ বিয়োগান্তর নাটক। বেঙ্গল থিয়েটারের কর্ণধার শরৎচন্দ্র ঘোষের অনুরোধে তিনি নাটকটি রচনা শুরু করেন। কিন্তু শেষ করতে পারেননি। এটি সমাপ্ত করেন ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায় মাইকেলের মৃত্যুর পরে এ নাটকটি প্রকাশিত হয়।
মধুসূদনের কাব্যগ্রন্থগুলোর নামঃ
'তিলোত্তমাসম্ভব' (১৮৬০): এটি বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। মহাভারতের সুন্দ-উপসুন্দ কাহিনি অবলম্বনে রচিত কাহিনিকাব্য। এটি যতীন্দ্রমোহন বাগচীকে উৎসর্গ করেন।
'চতুর্দশপদী কবিতাবলী' (১৮৬৬): বাংলা সাহিত্যের প্রথম
সনেট সংকলন। এতে মোট ১০২টি সনেট কবিতা আছে। মাইকেল ইতালিয় কবি পেত্রার্ক ও শেক্সপিয়রের অনুকরণে এগুলো রচনা করেন। এ সনেট সংকলনের বিখ্যাত কবিতা
'কপোতাক্ষ নদ' ।
'বীরাঙ্গনা' (১৮৬২): বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রকাব্য (অমিত্রাক্ষর)। এতে মোট ১১টি পত্র আছে। দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা, দশরথের প্রতি কৈকেয়ী, সোমের প্রতি তারা উল্লেখযোগ্য পত্র। এটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে উৎসর্গ করেন। এটি করুণ রসের পত্রকাব্য।
'ব্রজাঙ্গনা' (১৮৬১): কাব্যটির প্রথমে নাম ছিল 'রাধা বিরহ'। পরবর্তীতে এটির নামকরণ হয় 'ব্রজাঙ্গনা'। এটি রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক গীতিকাব্য (মিত্রাক্ষর)। রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক বৈষ্ণব পদাবলির আধুনিক পরিণতি এ কাব্য।
'Visions of the Past' (১৮৪৯): কাব্যটি তিনি মাদ্রাজে অবস্থানকালে ইংরেজিতে রচনা করেন।
মাইকেল মধুসূদনের মহাকাব্যের
'মেঘনাদবধ কাব্য' (১৮৬১): এটি রামায়ণের কাহিনি অবলম্বনে বীর রসের অমিত্রাক্ষর ছন্দে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য প্রভাবের সংমিশ্রণে রচিত বাংলা সাহিত্যের সর্বপ্রথম, সর্বশ্রেষ্ঠ ও সার্থক মহাকাব্য। এটি প্রথম ইংরেজিতে অনুবাদ করেন রাজনারায়ণ বসু। এটি উৎসর্গ করেন এ গ্রন্থটির মুদ্রণের ব্যয়বহনকারী রাজা দিগম্বর মিত্রকে। প্রধান চরিত্র: রাবণ, মেঘনাদ, লক্ষ্মণ, রাম, প্রমীলা, বিভীষণ, সীতা। ['মেঘনাদবধ কাব্য' কোন রসের কাব্য? এটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক আছে। মধুসূদন কাব্যের শুরুতেই দেবী বন্দনায় বলেছেন, 'গাইব, মা, বীর রসে ভাসি, মহাগীত।' যদিও শেষ পর্যন্ত এটিতে করুণ রসই প্রাধান্য পেয়েছে। তারপরও পরীক্ষায় এরকম প্রশ্ন আসলে উত্তর বীর রস দিতে হবে]
'হেক্টরবধ' (১৮৭১): এটি হোমারের 'ইলিয়াড' এর বঙ্গানুবাদ। এটি অসমাপ্তভাবেই প্রকাশিত হয়। এটি ভূদেব মুখোপাধ্যায়কে উৎসর্গ করা হয়।
'মেঘনাদবধ কাব্য'র মোট সর্গ ৯টি। যথা: ১ম- অভিষেক, ২য়- অস্ত্রলাভ, ৩য়- সমাগম, ৪র্থ- অশোক বন, ৫ম-উদ্যোগ, ৬ষ্ঠ- বধ (বধো), ৭ম- শক্তিনির্ভেদ, ৮ম-প্রেতপুরী, ৯ম- সংক্রিয়া।
মধুসূদনের প্রহসনগুলোর নামঃ
'বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ' (১৮৫৯, সূত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান): বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রহসন। প্রথমে এটির নাম ছিল 'ভগ্ন শিবমন্দির'। এক লম্পট জমিদারের আচার-ব্যবহার ও দরিদ্র প্রজাদের দ্বারা উচিত শিক্ষা এই উপভোগ্য প্রহসনের মূল কাহিনি। মূল চরিত্র বুড়ো জমিদার ভক্তপ্রসাদ বাবু। কথায় কথায় ধর্মের কথা বলেন। কিন্তু পাড়ার মেয়েদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকান। তাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য পাড়ার কয়েকজন ছেলে ফন্দি আটেন। রাতের অন্ধকারে হানিফের সুন্দরী স্ত্রী ফাতেমার মাধ্যমে ভক্ত প্রসাদকে শিবমন্দিরে ডেকে এনে উত্তম-মধ্যম দিয়ে উচিত শিক্ষা প্রদান করেন।
'একেই কি বলে সভ্যতা' (১৮৫৯, সূত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান): নব্য ইংরেজি শিক্ষিত যুবকদের উচ্ছৃঙ্খলতা ও অনাচারের কাহিনিই এ প্রহসনের মূল সুর। কলকাতার আধুনিকতার আলোকে নবকুমার শিক্ষিত হচ্ছে। তার পিতা একজন পরম বৈষ্ণব সাধক। ফলে তিনি বৃন্দাবনেই থাকেন। একসময় তিনি কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। এই সুযোগে নবকুমার কলকাতার নব্যশিক্ষিত যুবকদের নিয়ে 'জ্ঞানতরঙ্গিনী সভা' নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। যার উদ্দেশ্য মদ্যপান ও বারবণিতা সঙ্গলাভ। নবকুমার অধিক রাতে মদ্যপান করে মাতাল হয়ে ঘরে ফিরলে তার বাবা অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং কলকাতার বসতি উঠিয়ে নিতে মনস্থ করেন। এটিই এ প্রহসনের মূল বক্তব্য।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মহাকাব্য
পত্রকাব্য
গীতিকাব্য
আখ্যান কাব্য
Read more